বর্ধমানের ছোট্ট একটি গ্রামে বসত বন্দনার. বন্দনার জীবন ছিলো একটি ছোট্ট গ্রামে। স্বামী ছিলো কৃষক, কিন্তু এক দুর্ঘটনায় তাকে হারানোর পর, বন্দনার জীবন একাই চলছিল। তার একমাত্র সম্বল ছিলো তার নবজাতক শিশু, নাম রেখেছিলো "অরণ্য"। এই ছোট্ট শিশুটিই তার পৃথিবী, তার জীবনের আশ্রয়।
বন্দনা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করতো। অন্যের ঘরে কাজ করে, ফসলের মাঠে দিনমান কাটিয়ে সে অরণ্যকে একটু ভালোভাবে বড় করার স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু বিধি বাম। গ্রামের খরার পরিমাণ বাড়ছিল। খাবারের দাম বেড়ে যাচ্ছিল, কাজের সুযোগ কমছিল। বন্দনা অনেক চেষ্টা করেও অরণ্যের জন্য ঠিক মতো দুধ আর খাবার জোগাড় করতে পারছিল না।
একদিন, অরণ্য জ্বরাক্রান্ত হলো। শিশুটির কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে আসছিল, চোখের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছিল সে কাঁদতে চায়, কিন্তু শক্তি নেই। বন্দনা ডাক্তার আনতে চেয়েছিল, কিন্তু ডাক্তারকে ডাকার পয়সা ছিল না। গ্রামের হাসপাতাল অনেক দূরে, পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়।
এক রাতে বন্দনা অনেকক্ষণ ধরে অরণ্যকে বুকে জড়িয়ে রাখলো। শিশুটি ক্ষুধার্ত ছিল, কিন্তু বন্দনার নিজের পেটও খালি। অরণ্যের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নিজের চোখের পানি তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল বন্দনা।
পরদিন সকালে, অরণ্যের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। বন্দনার জগৎ অন্ধকার হয়ে গেল। কান্নার শব্দ যেন গাছপালার মধ্যেও প্রতিধ্বনিত হলো।
বন্দনা আর সহ্য করতে পারছিল না। নিজের সমস্ত কষ্ট আর দুঃখ এক চিঠিতে লিখে গেল।
"অরণ্য, মা ব্যর্থ হয়েছে। তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি। এই পৃথিবী তোমার জন্য ভালো কিছু দিতে পারলো না। হয়তো পরপারে তুমি ভালো থাকবে। তোমার মা তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না।"
সেই রাতে বন্দনা গ্রামের পুকুরে ঝাঁপ দিল। কেউ আর তাকে খুঁজে পেল না। পরদিন ভোরে অরণ্যকে একটি সাদা কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় গ্রামের মন্দিরের পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেল। কেউ একজন মায়ের লেখা চিঠি তার পাশে রেখে গিয়েছিল।
গল্পটি দুঃখের, কিন্তু এটি আমাদের একটি বড় বার্তা দেয়: দরিদ্রতার শিকল ভাঙতে, সমাজের সহানুভূতি এবং একত্রিত প্রচেষ্টা খুবই জরুরি।
