বুধবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৪

যারা আপনাকে মূল্য দেয়, তাদের সঙ্গ ধরুন। তবেই আপনি নিজের প্রকৃত মূল্যায়ন পাবেন

 শিলিগুড়ি একটি মাঝারি আকারের শহর। আকারে মাঝারি হলেও, মানুষের ভিড় এবং গাড়ির ব্যস্ততায় শহরটি যেন কখনও স্থির হয় না। পাহাড়ঘেঁষা এই শহরে এক বিখ্যাত সাধু এসে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি মানুষের সমস্যার সমাধান করেন, আর তার কাছে গেলে কেউই খালি হাতে ফেরে না।

শিলিগুড়ি থেকে কিছু দূরের একটি গ্রামে ধনেশ নামে এক ব্যক্তি বাস করত। যদিও তার নাম ধনেশ, কিন্তু তার জীবনে অর্থাভাব নিত্যসঙ্গী। একদিন ধনেশ শুনল সেই বিখ্যাত সাধুর কথা, আর তার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা হল। এক ভোরে সে তার সাইকেল নিয়ে রওনা দিল। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে শহরে পৌঁছে অনেক খুঁজে সাধুর আস্তানা খুঁজে বের করল।

ধনেশ সাধুকে প্রণাম করে বলল,
“বাবা, আমার জীবনে অনেক দুঃখ। দেনার দায়ে ডুবে আছি। কেউ আমাকে সাহায্য করতে চায় না। আমার জন্য কিছু করুন, যাতে আমি এই দুঃখমুক্ত হতে পারি।”

সাধু ধনেশের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি কী কাজ করো?”

ধনেশ উত্তর দিল,
“আমি ডাব বিক্রি করি


 কিন্তু ব্যবসা খুব একটা চলে না। কোনোমতে দিন কাটাই। ধারদেনার চাপে প্রতিদিন লোকেরা এসে আমাকে হুমকি দিয়ে যায়। আপনি কি আমার এই অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবেন?”

সাধু মৃদু হেসে বললেন,
“আমি তোমাকে একটি নীল পাথর দিচ্ছি। এই পাথরটি তুমি এই শহরের কারো কাছে বিক্রি করে দাও।”

ধনেশ পাথরটি হাতে নিয়ে দেখল, এটি খুবই চকচকে আর সুন্দর। খুশিমনে সে পাথরটি নিয়ে সাধুকে প্রণাম জানিয়ে শহরে বিক্রির জন্য বেরিয়ে পড়ল।

প্রথমে এক পথচারীর কাছে গিয়ে পাথরটি দেখিয়ে বিক্রির প্রস্তাব দিল। লোকটি পাথরটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বলল,
“এটা কাঁচের জিনিস মনে হচ্ছে। দেখতে সুন্দর, তবে আমার কাজে আসবে না। বড়জোর ৫০০ টাকা দিতে পারি।”

ধনেশ ভেবে নিল, “এত সুন্দর পাথরের দাম মাত্র ৫০০ টাকা! না, আমি এটি বিক্রি করব না।”

এরপর সে একটি ফার্নিচারের দোকানে গেল। দোকানের মালিক পাথরটি দেখে বলল,
“দেখতে সুন্দর তো বটেই, ফার্নিচারের সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করা যাবে। এর জন্য আমি ২০০০ টাকা দিতে পারি।”

ধনেশ এখানেও পাথরটি বিক্রি করল না। এবার সে একটি সোনা বিক্রেতার কাছে গেল। সোনা বিক্রেতা পাথরটি দেখে বলল,
“এই পাথরটি আংটিতে বসানোর জন্য আদর্শ। এর জন্য ১০,০০০ টাকা দিতে পারি।”

তবুও ধনেশ মনে করল, “এটি আরও বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব।” সে ভাবল হীরার দোকানে গেলে কী হয় দেখা যাক।

শেষমেশ ধনেশ পাথরটি নিয়ে একটি হীরার দোকানে গেল। সেখানে হীরার বিশেষজ্ঞ পাথরটি হাতে নিয়ে একবার দেখলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঠেকিয়ে বললেন,
“এই পাথরটি অমূল্য রত্ন। এর মূল্য আমার সব সম্পত্তি বিক্রি করেও মেটানো সম্ভব নয়!”

ধনেশ তখন বুঝতে পারল, জিনিসের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেটি কার কাছে এবং কোথায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। সেই সাথে সাধুর শিক্ষা হাতেনাতে বুঝে গেল।

ধনেশ খুশিমনে সাধুর কাছে ফিরে গিয়ে বলল,
“বাবা, আপনি যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা আমি স্পষ্ট বুঝেছি। এই রত্নটি আমি আপনার কাছেই রেখে যেতে চাই। আমি এখন এই শহরে ডাবের ব্যবসা করব। কারণ গ্রামে ডাবের কদর নেই। কিন্তু শহরে ডাবের চাহিদা অনেক বেশি। এখানেই আমার অভাব দূর হবে।”

শিক্ষণীয় বিষয়:
সবকিছুর মূল্য সর্বত্র সমান হয় না। জিনিসের কদর নির্ভর করে সেটি কার কাছে পৌঁছায়। একইভাবে জীবনের ক্ষেত্রেও এমন সময় আসে, যখন আমরা এমন কারো কাছে মূল্য পাওয়ার আশা করি, যে আমাদের গুরুত্ব দেয় না। তখন আমাদের উচিত সেখান থেকে সরে এসে এমন জায়গা খোঁজা, যেখানে আমাদের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।

বর্ধমানের ছোট্ট একটি গ্রামে মায়ের অন্তিম চিঠি

বর্ধমানের ছোট্ট একটি গ্রামে বসত বন্দনার. বন্দনার জীবন ছিলো একটি ছোট্ট গ্রামে। স্বামী ছিলো কৃষক, কিন্তু এক দুর্ঘটনায় তাকে হারানোর পর, বন্দনার জীবন একাই চলছিল। তার একমাত্র সম্বল ছিলো তার নবজাতক শিশু, নাম রেখেছিলো "অরণ্য"। এই ছোট্ট শিশুটিই তার পৃথিবী, তার জীবনের আশ্রয়।

বন্দনা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করতো। অন্যের ঘরে কাজ করে, ফসলের মাঠে দিনমান কাটিয়ে সে অরণ্যকে একটু ভালোভাবে বড় করার স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু বিধি বাম। গ্রামের খরার পরিমাণ বাড়ছিল। খাবারের দাম বেড়ে যাচ্ছিল, কাজের সুযোগ কমছিল। বন্দনা অনেক চেষ্টা করেও অরণ্যের জন্য ঠিক মতো দুধ আর খাবার জোগাড় করতে পারছিল না।

একদিন, অরণ্য জ্বরাক্রান্ত হলো। শিশুটির কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে আসছিল, চোখের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছিল সে কাঁদতে চায়, কিন্তু শক্তি নেই। বন্দনা ডাক্তার আনতে চেয়েছিল, কিন্তু ডাক্তারকে ডাকার পয়সা ছিল না। গ্রামের হাসপাতাল অনেক দূরে, পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়।


এক রাতে বন্দনা অনেকক্ষণ ধরে অরণ্যকে বুকে জড়িয়ে রাখলো। শিশুটি ক্ষুধার্ত ছিল, কিন্তু বন্দনার নিজের পেটও খালি। অরণ্যের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নিজের চোখের পানি তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল বন্দনা।

পরদিন সকালে, অরণ্যের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। বন্দনার জগৎ অন্ধকার হয়ে গেল। কান্নার শব্দ যেন গাছপালার মধ্যেও প্রতিধ্বনিত হলো।

বন্দনা আর সহ্য করতে পারছিল না। নিজের সমস্ত কষ্ট আর দুঃখ এক চিঠিতে লিখে গেল।
"অরণ্য, মা ব্যর্থ হয়েছে। তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি। এই পৃথিবী তোমার জন্য ভালো কিছু দিতে পারলো না। হয়তো পরপারে তুমি ভালো থাকবে। তোমার মা তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না।"

সেই রাতে বন্দনা গ্রামের পুকুরে ঝাঁপ দিল। কেউ আর তাকে খুঁজে পেল না। পরদিন ভোরে অরণ্যকে একটি সাদা কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় গ্রামের মন্দিরের পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেল। কেউ একজন মায়ের লেখা চিঠি তার পাশে রেখে গিয়েছিল।

গল্পটি দুঃখের, কিন্তু এটি আমাদের একটি বড় বার্তা দেয়: দরিদ্রতার শিকল ভাঙতে, সমাজের সহানুভূতি এবং একত্রিত প্রচেষ্টা খুবই জরুরি।

যারা আপনাকে মূল্য দেয়, তাদের সঙ্গ ধরুন। তবেই আপনি নিজের প্রকৃত মূল্যায়ন পাবেন

 শিলিগুড়ি একটি মাঝারি আকারের শহর। আকারে মাঝারি হলেও, মানুষের ভিড় এবং গাড়ির ব্যস্ততায় শহরটি যেন কখনও স্থির হয় না। পাহাড়ঘেঁষা এই শহরে এক...